গাজীপুরের কাচিঘাটা রেঞ্জের খলিশাজানি বিটে সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে অবৈধভাবে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। বন বিভাগের নীরব ভূমিকার কারণে প্রতিনিয়ত ভেকুর ব্লেডে কাটা পড়ছে সংরক্ষিত বনের টপ সয়েল। সংরক্ষিত বনের ভিতর দিয়েই পরিবহন করা হচ্ছে মাটি বহনকারী ড্রাম্প ট্রাক। এতে শুধু বন উজাড়ই হচ্ছে না, জীববৈচিত্র্যও পড়েছে চরম হুমকির মুখে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বহেড়াতলি, রামচন্দ্রপুর বাজারের পূর্ব পাশে মোফা মার্কেটের উত্তর দিক এবং রামচন্দ্রপুর কান্দর বাইদ—এই তিনটি এলাকায় বন সংলগ্ন জমি থেকে মাটি কেটে বিক্রির মহোৎসব চলছে। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতর দিয়েই তৈরি করা হয়েছে ড্রাম্প ট্রাক চলাচলের রাস্তা। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগ এই চক্রকে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করছে।
বহেড়াতলি চার রাস্তার পূর্ব পাশে কাউরানের কৃষি জমির উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে আকাশমনি ও গজারি বন। এখান থেকেই দীর্ঘদিন ধরে মাটি কেটে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কালিয়াকৈর উপজেলা ওলামা দলের সদস্য সচিব মামুনুর রশিদ (মামুন) গত মাস থেকে ভেকু দিয়ে মাটি কাটার কাজ শুরু করেন। রাতের আঁধারে ১০-১৫টি ড্রাম্প ট্রাক দিয়ে মাটি বিভিন্ন কোম্পানিতে এবং নিচু জমি ভরাটের জন্য বিক্রি করা হয়।
এছাড়া, রামচন্দ্রপুর কান্দর বাইদ এলাকায় শরিফের কৃষি জমি থেকে মাটি কাটারও অভিযোগ পাওয়া গেছে। সংরক্ষিত বনঘেঁষা এই জমির মাটি কেটে নিচ্ছে মোবারকসহ আরও কয়েকজন। একইভাবে, রামচন্দ্রপুর মোফা মার্কেটের উত্তর পাশেও স্থানীয় ইয়ার উদ্দিনের কৃষিজমিতে পুকুর খননের নামে মাটি বিক্রি করা হচ্ছে। এ মাটি কিনেছে বারতোপার তোফাজ্জল, পিরুজালীর সোহেল ও নাজমুল ফকির।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মামুনুর রশিদ (মামুন) বলেন, "আমি শুধু জমি বিক্রির ঝামেলা মিটিয়ে দিয়েছি, মাটি কাটছে ছাত্রদলের ছেলেরা।" তবে কারা কাটছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "ছাত্রদল, যুবদল ও মূল দলের সবাই মিলেই নিচ্ছে।"
বাংলাদেশের বিদ্যমান বন আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘেঁষে পুকুর বা খামার খনন করার সুযোগ নেই। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলে প্রশাসনের অনুমতি নিতে হয়। এছাড়া, ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির পাশে সরকারি ভূমি থাকলে ডিমারকেশন বাধ্যতামূলক। কিন্তু খলিশাজানি বিটে এ নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করেই নির্বিচারে মাটি কাটা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তার মদদেই চলছে এই মাটি ব্যবসা। মাটি ব্যবসায়ীরা শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি থেকেই নয়, সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকেও মাটি কেটে নিচ্ছে। ফলে পরিবেশের বিপর্যয়, কৃষি উৎপাদন হ্রাস ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের এলাকার বন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বন বিভাগ নির্বিকার। উল্টো কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা এদের সহযোগিতা করছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে খলিশাজানি বিট কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফা বলেন, তারা তাদের রেকর্ডের জায়গা কাটতেছে।তবে আমাদের জায়গা ব্যবহার করতেছে এটা ঠিক আছে। তারা বিএনপির লোক। আমরা তাদেরকে আমাদের জায়গা ব্যবহার করতে নিষেধ করছি তারা শুনে না।
অবৈধভাবে বনাঞ্চলের মাটি কাটার ফলে পরিবেশের বিপর্যয় নেমে এসেছে। ধুলোবালিতে এলাকাবাসী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে সরকার নিরলসভাবে কাজ করলেও বনখেকোদের কারণে পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। সংরক্ষিত বন ধ্বংসকারী দালালচক্র ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি বন বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। অন্যথায় পরিবেশের এই ধ্বংসযজ্ঞ রোধ করা সম্ভব হবে না।
আপনার মতামত লিখুন :