ঢাকা | বঙ্গাব্দ

চোখের বালি

  • আপলোড তারিখঃ 09-06-2024 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 1417 জন
চোখের বালি ছবির ক্যাপশন: চোখের বালি
ad728

মোঃ মিলন হক : গ্রামের নাম বড়বাড়ি সেই গ্রামের জমিদার হেলাল চৌধুরী। হেলাল চৌধুরী একজন বৃত্তবান পরাক্রমশালী।তার বংশের শেষ চিহ্ন এবং পদবী শুধু রয়েছে । অতীতের গৌরবময় ঐশ্বর্য্যের সময়ের পরীক্রমায় কিছুটা লাঘব হয়েছে।
তারপরও হেলাল চৌধুরীকে এলাকায় লোকজন অনেক প্রচুর সম্মান করে ।তার স্ত্রীকে গরীব প্রজারা কর্তা মা বলে ডাকে।তার স্ত্রী বেশ প্রজা বৎসল।তার তিন সন্তান। দুই ছেলে ও এক মেয়ে।
তার নিজস্ব জমিদারিতে সংসারে ব্যয়।
দান দাক্ষিণ্যে তার রয়েছে প্রচুর সম্মান। সারাবছর তার বাড়িতে কাজের লোকের সমাগম ঘটে।
দূরদূরান্ত থেকে লোকজন তার বাড়িতে কাজের অন্বেষণে আসে।তিনি লোকজনকে নির্দিষ্ট মেয়াদের কাজ দেয়।যেমন খরার মৌসুমে নদীর পানি শুকিয়ে গেলে তার বড় বড় পুকুরে ও নদীর একাংশে মাছ ধরার কাজের জন্য আসে জেলে সম্প্রদায়ের জেলেরা ।তারা বর্ষার মৌসুম আসার আগে আবার তাদের নিজেদের গ্রামে ফিরে যায়।
দূরদূরান্ত থেকে তার ফসলি জমির ফসল কাটতে আসে অনেক মানুষ। অনেকে ফি বছর অবস্থান করে তার তাঁবুতে। অনেকে আবার রাখালের কাজ করে ।অনেকেই আবার পরিবারসহ অবস্থান করে হেলাল চৌধুরীর ডেরায়।
অনেক মহিলাও আসে হেলালের তাঁবুতে তাদের স্বামীর সঙ্গে এবং অনেকেই হেলালের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার তাগিদে। অনেক শিশু আসে তাদের বাবা মায়ের সাথে।
শিশুদের নতুন বাসস্থান ও নতুন জায়গায় বেশ ভালো লাগে আনন্দ উপভোগ করে
নহনা নদীর হাঁটু জল পানিতে কোন রকমে নদীতে নৌকো পারাপার হয়। একদিন দুপুর বেলা ঘাটে বসে কান্না করে একজন মহিলা। তিনি ব্যতীত ঘাট জনমানবহীন।জেলেরা তাদের অন্নহীন ঘর ছেড়ে সংসার চালানোর তাগিদে হেলাল চৌধুরীর বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয় গতকাল মাঘের রবির উদয়ের সঙ্গে সঙ্গে। আজ দুপুরে তারা পৌঁছে নহনা নদীর ঘাটে। ঘাটে এসে দেখে তীব্র কুহেলিতে ঘাট জনমানবহীন।
তারা নৌকা ঘাটে বেঁধে দেয় । খাওয়া এবং বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। ঘাটের কাছে তারা দেখে একজন মহিলা চব্বিশ পঁচিশ বছরের বট তলায় বসে কান্না করে।
তারা কাছে গেলে দেখে মহিলার গাঁয়ে শীতের বস্ত্র নেই ।তাদের মধ্যে বড় জেলে জালাল বলেন, ``বোন ,আপনার কি হয়েছে? এই তীব্র ঠাণ্ডায় একা বসে কেন কান্না করছেন ? আপনার বাড়ি কোথায়? এবং কোথায় যাবেন?`` মহিলা বলেন, ``ভাই আমার বাড়ি এই গ্রামের শেষ সীমার উত্তর প্রান্তে । আমার স্বামী মারা গেছে তিন বছর হলো ।আমার বাবা মা নেই ।আমি একাই কোন ভাই বোন নেই। বাড়িতে বৃদ্ধ শশুড় শাশুড়ি আছে ।তারা আমাকে সহ্য করতে পারে না তাদের ছেলে মারা যাওয়ায় ।আজ এক সপ্তাহ থেকে প্রায় অধ অনশনে থাকি ।কারো কাছে হাত পাততে ও পারি না । নদীতে এসেছিলাম মরতে। ``
জেলেরা মহিলার কথা শুনে নির্বাক। কিছুক্ষণ পর জালাল বলে বোন তোমাকে মরতে হবে না আমরা আছি।
বিধবার মনে বাঁচার বীজ অঙ্কুরিত হলো।
কান্না বন্ধ করে বলল ভাই, ``আপনারা কোথায় যাবেন?`` জালাল বলেন, ``হেলাল চৌধুরীর বাড়িতে।`` তিনি খুব ভালো মানুষ। আপনাকেও সেখানে নিয়ে যাবো যদি আপনার সম্মতি থাকে তাহলে!
কিছুক্ষণ পর জালাল রহমান ও করিমকে খাবারের বন্দোবস্ত করতে বলে। তিনি নৌকায় হুকা টানতে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর তার একটা কম্বল মহিলাকে গায়ে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য।
মহিলা গায়ে কম্বল জড়িয়ে বসে আছে এমতাবস্থায় করিম উনানে আগুন দিলে মহিলা বলে,``ভাই আমাকে ভাত রান্না করতে দেন।`` আপনি আমাকে সাহায্য করেন। করিম ইতস্তত করে উনান ছেড়ে দেয় এবং তরকারির আয়োজন করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। রান্না শেষ করে খাওয়া দাওয়া করে বিশ্রাম করে জেলেরা।
মহিলা বটতলার নিচে বসে থাকে।
বিশ্রাম শেষে মহিলার কাছে গিয়ে রহমান বলেন বোন আপনাকে বড়ভাই ডাকে।
মহিলা কাছে আসলে জালাল বলেন, ``বোন আপনি কি আমাদের সাথে যেতে রাজি আছেন?`` মহিলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করেন।
তখন জালাল বলে, তাহলে নৌকায় ওঠেন।
সন্ধ্যায় যায় পৌঁছে হেলাল চৌধুরীর বাড়িতে।
চৌধুরীর সঙ্গে রাত আটটায় দেখা করে।
দেখা করে মহিলারা বিষয়ে বলেন, মহিলার মুখে শুনা সব কথা । তারপর অনেক অনুনয় করে যেন হেলাল চৌধুরী তার বাড়িতে মহিলাকে রাখে।হেলাল চৌধুরী তার নাম ও স্বামীর নাম জিজ্ঞাসা করে এবং বাপের গ্রাম ও শ্বশুর বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করে।
মহিলা বলেন,`` আমার নাম জেরিন। স্বামীর নাম সাগর।বাপের কাশিমপুর। স্বামীর বাড়ি উদয়পুর।
কোন সন্তান হয় নি। স্বামী মারা গেছেন।বাবা-মাও মারা গেছেন। শ্বশুর- শাশুড়ি সহ্য করতে পারে না।আমি তাদের চোখের বালি।``তাই বাধ্য হয়ে মরতে এসেছিলাম নদীর ঘাটে।
হেলাল চৌধুরীর বলেন,আজ থেকে আপনাকে মরতে হবে না।আপনি আমার বাড়িতে থাকবেন।
হেলাল চৌধুরীর বাড়িতে আশ্রয় পেয়ে বেশ ভালো লাগলো। কিছুদিনের মধ্যে হেলাল চৌধুরীর বউ রুনার মনের মধ্যে কাজের মধ্যে দিয়ে জায়গা করে নেয়। রুনা তাকে অনেক স্নেহ করে। রান্না ঘরে রান্না করার সময় অনেক গল্প করে। হেলাল চৌধুরীর মাও বেশ ভালোবাসে।
তার ছেলে মেয়েরাও জেরিনকে বেশ ভালোবাসে।
জেরিন সবার ভালোবাসায় বিমোহিত।
হেলাল চৌধুরীর সাথে বেশি কথা হয় না উনি নানান কাজে ব্যস্ত থাকেন।
দিনে তিন বেলায়, শুধু খাওয়ার সময় দেখা হয় । জেরিনের রান্না খেয়ে, হেলাল চৌধুরী তার অনেক প্রশংসা করে। হেলাল চৌধুরীর স্ত্রী তাকে নিজ বোনের মতো ভালোবাসে। কোথাও বেড়াতে গেলে সঙ্গে নিয়ে যায়। জেরিনকে মাঝেমধ্যে দেখা করার জন্য জালাল, করিম ও রহমান আসতো।এভাবে পাঁচ মাস অতিবাহিত হলো জলাল, করিম ও রহমানের বাড়ি ফেরার দিন ঘনিয়ে এলো নিকটে।জলাল তার বাড়িতে জেরিনকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললে।রুনা বলেন,``সে এখানে থাকবে আমার সঙ্গে। আমার বাড়িতে।`` জেরিনকে রেখে তারা বিদায় নিয়ে চলে গেল।
একদিন রুনা তার বাপের বাড়ি চলে যায় কিছু দিনের জন্য। রুনা তার সংসারের সমস্ত দায়িত্ব জেরিনকে দিয়ে যায়। একদিন রাতে হেলাল চৌধুরী অসুস্থ হয়ে পড়েন।রুনা ডাক্টারকে নিয়ে আসার জন্য ফরিদকে পাঠায়। ডাক্টার চিকিৎসা দেয়। জেরিন অক্লান্ত এক সপ্তাহ,তার সেবা যত্ন দিয়ে হেলালকে সুস্থ করেন তোলেন।
জেরিনকে হেলাল চৌধুরীর ভালো লেগে যায়।
রুনা বাড়িতে এসে জানতে পারে, তার স্বামীর অসুস্থতার কথা এবং তার শাশুড়ির কাছে জেরিনের অক্লান্ত সেবা যত্নের কথা ।
জেরিনের প্রতি রুনার ভালোবাসা আরও বেড়ে যায়।
রুনা কিছু দিন পর আবার বিকেলে বাপের বাড়ি যায়।সেখানে তার মা অসুস্থ। অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। হেলাল চৌধুরী বাড়িতে ছিল না।তার মায়ের কাছে জানতে পারে।তার শাশুড়ি খুব অসুস্থ।রুনা দেখার জন্য গেছে ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে। জেরিন রাতে হেলাল চৌধুরীর খাবার পরিবেশন করে। হেলাল বলেন,``আপনি কি বিয়ে করতে রাজি আছেন?``জেরিন বলেন, ``এ দেহ প্রাণ যদি পায়,তারে সব উজাড় করে দিব । আমার মতো চোখের বালিকে কারো সংসারে হবে না ঠাঁয়।``
হেলাল বলেন,``যদি আপনার সম্মতি থাকে।আমি বিয়ে করতে চাই।`` জেরিন বলেন,`না।` আপনি কেন আমার প্রতি এত্তো মায়া দেখাবেন।
[যদিও এখানে বলে রাখা ভালো মনে মনে জেরিনের হেলাল চৌধুরীকে প্রথম দেখায় ভালো লেগে যায়]
আপনি এমনিতেই আমার অনেক উপকার করেছেন দয়া বশত আপনার বাড়িতে আশ্রয় দিয়ে। তাছাড়া আপনার সংসার আছে। আপনার বউ বাচ্চা আছে। আপনি কেন আমাকে বিয়ে করবেন? আমার মাঝে কি এমন আছে, যে আপনি আমাকে বিয়ে করতে চান?
এভাবে কিছু দিন যায় একদিন দুপুরে হুক্কা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য জেরিনকে ডাকে হেলাল।
হেলাল জেরিনকে বলেন, ``সেদিন যে রাতে বললাম ঐ বিষয়ে কিছু ভেবেছেন কি?`` জেরিন বলে,`না।` একথা বলার পর জেরিন রুম থেকে বের হয়ে তার রুমে যায়। বিছানায় শুয়ে কল্পনা করতে থাকে। জেরিনের মন ডানা ভাঙ্গা পাখির মতো উড়তে চায়।
রুনা ও জেরিনের মধ্যে আরও অনেক মধুময় হয়। রুনা তার জীবনের সব দুঃখ, আনন্দ ভাগ করে। হেলালের বাড়িতে জেরিনের নিজের বাড়ির লোকের মতোই সম্মান। তাকে কেউ কাজের লোক মনে করে না।
অপরদিকে তাকে বিভিন্ন ছল করে হেলাল তার কাছে ডাকে এবং বিয়ে করার প্রস্তাব দেয়।
একদিন সন্ধ্যায় বাড়িতে কারেন্ট না থাকায়। জেরিন হেলালের রুমে যায় হারিকেনের আলো দিতে। হেলাল রুমে শুয়ে ছিল।
তাকে দেখে বলে বসেন ,কিছু কথা আছে।
জেরিন বলে,বলেন কী কথা? হেলাল বলে, ``আপনি আমার প্রস্তাবে রাজি নই কেন?`` জেরিন বলে,``যদি আপনার প্রস্তাবে রাজি হয় আমাকে রাখবেন কোথায়?`` হেলাল বলে, ``আমার মনের মধ্যে। আপনার যেখানে ইচ্ছে।`` তারপর হেলাল জেরিনকে জড়িয়ে ধরে।
এরপর একদিন রাতে লুকিয়ে বিয়ে করে।
বিয়ের ছয় মাস পর একদিন রুনা তাদের বেশ অন্তরঙ্গ দৃশ্যে দেখে!যা কোন দিন রুনা জেরিনের কাছে প্রত্যাশা করে নি। সেই ঘটনার পর জানতে পারে হেলাল ও জেরিন বিয়ে করেছে।
এরপর জেরিন হয়ে ওঠে রুনার চোখের বালি। 


নিউজটি পোস্ট করেছেনঃ সকালের শিরোনাম

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে : চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী